তারিখ : ২৪ নভেম্বর ২০২০, মঙ্গলবার

সংবাদ শিরোনাম


বিস্তারিত বিষয়

অভুক্ত প্রাণীদের খাওয়াবে কে?

অভুক্ত প্রাণীদের খাওয়াবে কে?
[ভালুকা ডট কম : ১৬ এপ্রিল]
সম্প্রতি করোণা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সামাজিক তথা শারিরীক দুরত্ব বজায় রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এলক্ষ্যে একাধিক প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহন করেছে সরকার। অনেকেই এসকল উদ্যোগের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করে জন সচেতনতা মূলক কাজ করে যাচ্ছেন।

পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে কর্মহীন মানুষের পশে খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় ভোগ্যপন্য সহযোগিতা তারা করে যাচ্ছেন। যখনই  এদেশে কোন দুর্যোগ-মহামারি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তখনই এদেশের অধিকাংশ মানুষ ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। এটা বাঙালীদের একটি জন্মগত বৈশিষ্ট। এ অবস্থায় যদি আমরা সবাই স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলি তবে অবশ্য আমরা এই মহামারি থেকে রক্ষা পাবো। মানুষকে রক্ষা করতে সরকারি বেসরকারি সকল স্তরের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

তবে এরমধ্যে একটি বিষয় লক্ষণীয়। তা হলো- জন সমাগম হয় এমন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান- যেমন হোটেল, রেস্তোঁরা, চায়ের দোকান, গণ পরিবহন ইত্যাদি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ইহা নিঃসন্দেহে করোণা ভাইরাস প্রতিরোধে একটি নির্ভরযোগ্য প্রক্রিয়া। এতে উপার্জনহীন খাদ্য সংকটে পতিত লোকদের সরকার সাধ্যমত জরুরী খাদ্যও সরবরাহ করছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রাণপণে কাজ করে যাচ্ছেন, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, সেনাবাহিনী, আইন-শৃংখলা বাহিনী, বিভিন্ন এনজিও, দানশীলব্যক্তি ও গণমাধ্যমকর্মী। এর মধ্যে আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি- হোটেল-রেস্তোঁরা বন্ধ থাকায় উচ্ছিষ্টভোগী কুকুর ও কাক অভূক্ত থেকে যাচ্ছে। অধিকাংশ হোটেল-রেস্তোঁরার মালিকেরা প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক পাখির খাবার দিয়ে থাকেন।  তা বন্ধ থাকায় পক্ষীকুলও পড়েছে চরম খাদ্য সংকটে। এ অবস্থায় যে কোন মূহুর্তে খাদ্য অভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতে পারে কুকুরগুলো। দৃশ্যমান হচ্ছে না আগের মত পাখি। গভীর রাতেও শোনা যায় পাখির বাসায় ক্ষুধার্ত পক্ষী শাবকদের কান্না, মা পাখির আহাজারি। ক্ষুধার্ত কুকুরের ঊর্ধমুখী হয়ে আর্তনাদ, যেন বিধাতার কাছে তারা ফরিয়াদ করছে। খবরে প্রকাশ ইতোমধ্যেই রাজশাহীতে ক্ষুধার্ত কুকুরের দল খেয়ে ফেলেছে কয়েকটি হরিণ। এই খাদ্য সংকট দীর্ঘায়িত হলে জীববৈচিত্র্যে নেমে আসতে পারে করুণ পরিণীতি। আর প্রাকৃতিকভাবেই হয়তো এই পরিণীতির চরম খেসারত দিতে হতে পারে আমাদের জীবনযাত্রায়।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন -১৯৬২ সালে র‌্যাচেল কারাসন সুনির্দিষ্টভাবে পরিবেশের কথা তুলে ধরলেন তার ‘সাইলেন্ট স্প্রিরং’ বইতে। তিনি বললেন, বসন্ত নীরব হতে চলেছে। পাখি আর গাইবে না। তাই পাখির কলতানে মুখরিত হবে না বসন্তের দিনগুলো। কেননা বিষাক্ত কীটনাশক রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারের ফলে ফসল তোলার পর মাটিতে পড়ে থাকা শস্য খেয়ে পাখি প্রাণ হারাবে। এমনিভাবে আরো কত বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে। এ থেকেই জন্ম নিলো পরিবেশ ভাবনা। ১৯৬২-তে লেখিকা র‌্যাচেল কারাসন যে ভাবনার সূত্রপাত করলেন সে ভাবনার সম্প্রসারণে ১৯৭২ সালে জাতিসঙ্ঘের ডাকে বিশ্বের ৯৩টি দেশের প্রতিনিধিরা স্টকহোমে বসলেন বিশ্ব পরিবেশ সম্মেলনে। দীর্ঘ আলোচনার পর ২৬টি ধারা সংবলিত ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর করলেন অংশগ্রহণকারী দেশের প্রতিনিধিরা। স্টকহোমের এ ঘোষণাপত্রই হলো বিশ্ব পরিবেশের ম্যাগনাকার্টা। এর প্রথম ধারাতে বলা হয়েছে বিশুদ্ধ নির্মল পরিবেশ মানুষের জন্মগত অধিকার। এ দ্বিতীয় ধারায় রয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদ অর্থাৎ বাযু, পানি, মাটি, উদ্ভিদ ও প্রাণি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা। আর তারই ধারাবাহিকতায় মানুষকে পরিবেশ-সচেতন করে তুলতে এ বক্তব্য সামনে রেখে ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের যাত্রা শুরু হয়।

এছাড়াও ১৯৭০ খৃষ্টাব্দে আর্থ ডে, ১৯৭২ খৃষ্টাব্দে স্টকহোমে মানব-পরিবেশ শীর্ষক কনফারেন্স, ১৯৮০-র দশকে লন্ডন, বাজেল ও ভিয়েনায় কনভেনশন, ১৯৯২ খৃষ্টাব্দে বসুন্ধরা সম্মেলন, কিয়োটোতে পরিবেশ মহাসম্মেলন। তারই জের হিসেবে বিভিন্ন দেশের দি ওয়াইল্ড লাইফ অ্যাক্ট, দি ওয়াটার অ্যাক্ট, দি এয়ার অ্যাক্ট, দি ফরেস্ট কনজারভেশন অ্যাক্ট ইত্যাদি পদক্ষেপ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার অবিলম্ব প্রয়োজন সম্পর্কে সমগ্র বিশ্বকেই সচেতন করতে চেয়েছে। বাংলাদেশেও সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে পরিবেশ আন্দোলন বেশ জোরেসোরেই চলমান রয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ও সার্বিক পরিবেশ রক্ষার নিমিত্ত পুরাতন আইনের নবায়ন ও পরিবেশগত নীতিমালাসহ নতুন নতুন আইন পাশ করা হয়েছে।

আমাদের দেশে ২০১২ সালে বন্যপ্রাণি ও প্রকৃতি সংরক্ষণ আইন পাশ করা হয়েছে। এ আইনকে মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে সরকারের পাশাপাশি কাজ করে চলেছেন দেশের সেচ্ছাসেবী পরিবেশবাদী বেশকিছু সংগঠন। সরকার অতীব প্রভূভক্ত ও পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাণি কুকুর প্রজাতি রক্ষা করার মহান উদ্দেশ্যে অতি মূল্যবান  ‘এন্টির‌্যাবিস ভ্যাকসিন’ প্রয়োগ করছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিচ্ছে। সেই কুকুর যদি খাদ্য অভাবে মারা যায় তবে তা অতীব পরিতাপ ও অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক হবে। অকৃতজ্ঞতার কথা একারণেই বলছি-‘মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে ‘জুনিয়র জীব’। আর অন্যান্য যেসব প্রাণিকে আমরা নিকৃষ্ট বলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করি। এসব প্রাণি আমাদের অনেক অনেক ‘সিনিয়র’। কারণ মহান স্রষ্টা মানবজাতি পৃথিবীতে পাঠানোর অনেক আগে এদের সৃষ্টি করেছেন। প্রত্নতাত্তিক বিজ্ঞানীদের ধারণা প্রায় দুইলাখ বছর পুর্বে মানুষ জোটবদ্ধভাবে পৃথিবীতে বসবাস শুরু করে। মাত্র সাড়ে ৫হাজার বছর আগেও মানুষ গুহায় বাস করতো। মানুষ এখন যেসব প্রাণি গৃহপালিত হিসাবে দাবি করে এর সবই ছিল বন-জঙ্গলে। এদের মধ্যে প্রথম পোষ মানে কুকুর। সেসময়ে প্রভূভক্ত কুকুর বন-জঙ্গল থেকে বিভিন্ন প্রাণি শিকার করে এনে দিত। আর আমাদের পুর্বপুরুষেরা তা আহার করে জীবন ধারণ করেছেন। কুকুরদেরও একটা অংশ দেয়া হতো। এরপর তারা আমাদের পুর্ব পুরুষের আবাসস্থল গুহার মুখে সারিবদ্ধভাবে থেকে পাহারা দিয়ে জোটবদ্ধবাবে হিংস্র প্রাণির হামলা থেকে মানুষকে রক্ষা করতো। এভাবে কেটেছে প্রায় ৭০ হাজার বছর।  সুদীর্ঘ সময় ধরে প্রভূভক্ত এই প্রাণিগুলো বংশানুক্রমে আমাদের এভাবে সেবা দিয়ে এসেছে। নোংড়া বিষাক্ত দ্রব্য খেয়ে পরিবেশকে পরিমল রেখেছে। আমরা তাই পুরুষানুক্রমে এদের কাছে ঋণী। তারা আজ খাদ্য অভাবে আমাদেরই চোখের সামনে মারা যাবে, এটা কী তাদের প্রতি আমাদের চরম অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক হবেনা ?

শুধু তাই নয় কুকুর বিহীন জনপদে শিয়াল, বাগডাসাসহ বিভিন্ন হিংস্র প্রাণির তান্ডব ও চোর বদমাশদের উপদ্রবে বাসবাস করাই কঠিন হয়ে পড়বে। উল্লেখ্য, মুসলিম জাহানে শাসনকর্তাদের মধ্যে বিশেষভাবে ইতিহাসখ্যাত হয়রত উমর (রাঃ) একটি বিশেষ সময়ে বলেছিলেন- “যদি ফোরাত নদীর তীরেও একটা কুকুর অনাহারে মারা যায় তবে আল্লাহ্র কাছে জবাবদিহি করতে হবে। ”  এসবকিছু বিবেচনায় আমাদের কী করা উচিৎ ?

আমরা জানি জীববৈচিত্র্য প্রকৃতির অন্যতম সুরক্ষা কবজ। যার সুশৃংখল অবস্থান ও গতিময়তা আমাদের যুগ যুগ ধরে উপহার দিয়ে আসছে পরিমল পরিবেশ ও প্রতিবেশ। মানুষের সাচ্ছন্দ্যময় নিরাপদ জীবনযাত্রায় সবচেয়ে বেশি যে সকল প্রাণির সরাসরি অবদান অনস্বীকার্য। সে সকল প্রাণির মধ্যে কুকুর, কাক, দোয়েল, শালিকসহ বিভিন্ন পক্ষীকুল অন্যতম। সংগত কারণেই বিপন্ন ও খাদ্য সংকটে পতিত উল্লেখিত প্রাণিকূল রক্ষা করা জরুরী। তবে সেটা তাদেরকে খাবার পরিবেশনের মত বাড়তি কোন কর্মসূচির জন্য নয়। কেননা যে ভাবে ঐ প্রণিগেুলো খাবার সংগ্রহ করতো তার অনেকটাই ব্যাতয় ঘটবে । আর হয়তো শেষ অবধি এটা চালু রাখাও সম্বব হবে না (যদিও দেশের বিভিন্ন স্থানে সেচ্ছসেবী পরিবশে সচেতন কিছু সংখ্যক তরুণ রান্না করা খাবার এদের মধ্যে পরিবেশন করছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল)। আমাদের ধারণা- হোটেল-রেস্তোরাগুলো যদি প্যাকেট খাবার সরবরাহ করার জন্য অনুমতি পায়। তাহলে এসব উচ্ছিষ্টভোজী বে-ওয়ারিশ কুকুর ও পক্ষীকূল রক্ষা পাবে। তবে কোন গ্রাহক হোটেলের ভিতর আগের মত বসে খাবেন না। হোটেলের সামনে চিহ্নিত দুরত্বে থেকে গ্রাহকেরা খাবার প্যাকেট ও পানির বোতল সংগ্রহ করতে পারবেন।  তবে হোটেল মালিক ও কর্মচারীরা  তাদের আশপাশের কুকুর, বিড়াল ও পাখিদের খাবার দিবেন।  এসব কিছু হতে হবে সরকারি নির্দেশনা মেনে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখেই। এতে চলমান চারটি সমস্যার হয়তো সমাধান হতে পারে।

যেমন ঃ
(১) বন্ধ হোটেল-রেস্তোরার বিপুল সংখ্যক কর্মহীন শ্রমিকের কর্মহীনতা দুর হওয়ার পাশাপাশি সরকারি সাহায্য তহবিলের উপর চাপ কমবে।
(২) জরুরী সেবাদানে নিয়োজিত সরকারি বেসরকারি কর্মীদের খাদ্য ও পানীয় সংকট দুর হবে। এছাড়াও সড়ক-মহাসড়কের পাশে হোটেল রেস্তোঁরা এভাবে চালু থাকলে পন্য পরিবহনে নিয়োজিত চালক হেলপার ও শ্রমিকদের খাদ্য সংকট ও ওয়াশরুম ব্যবহারের সংকট দুর হবে।
(৩) হোটেল-রেস্তোঁরা গুলোর সাথে সরবরাহে নিয়োজিত লাকড়ি, মাছ-মাংস, সবজি ও মুদি দোকানীদের আয় অব্যাহত থাকবে। অভূক্ত লোকের সংখ্যা অনেক কমবে।
(৪) লক ডাউন এলাকায় প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে অথবা ডিউটিরত প্রশাসনের লোকজনদের মাধ্যমে এলাকার বিভিন্ন পরিবারের ওর্ডারী খাবারও তারা পৌঁছে দিতে পারবেন। এতে হোটেলের খাবারের উপর নির্ভরশীল ব্যক্তিরাও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবেন। তবে এধরণের সকল কাজই হতে হবে সদাশয় সরকার ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সকল নির্দেশনা অবশ্যই মেনে চলার মধ্য দিয়ে। সংগত কারণেই বিষয়টি জরুরী ভিত্তিতে বিবেচনা করতঃ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা উচিত।
লেখক ঃ পরিবেশবাদী সাংবাদিক, সভাপতি -সেচ্ছসেবী পরিবেশবাদী সংগঠন-‘মুক্তজীবন’।#



সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

অন্যান্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ১২৯৬ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই