তারিখ : ২৫ নভেম্বর ২০২০, বুধবার

সংবাদ শিরোনাম


বিস্তারিত বিষয়

উপকারী লকডাউনে প্রকৃতির পুনর্বাসন

উপকারী লকডাউনে প্রকৃতির পুনর্বাসন
[ভালুকা ডট কম : ০৯ জুন]
প্রয়োজনের তাগিদে নিজেদের উপযোগী করার জন্য মানুষ পরিবেশকে শাসন করার নেশায় মত্ত। সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন সাধনের জন্যে বিকল্প আর কৃত্রিম ভাবনায় বিভোর হয়ে আছে গোটা বিশ্ব। বিশ্ব সভ্যতা আজ এমন এক অবস্থার তৈরি করেছে যেখানে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হতে চলেছে। অবহেলিত প্রকৃতি নিজের চেষ্টায় স্বরূপে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করছে। এ দ্বন্দ্বে দূষিত পরিবেশ বিশুদ্ধ হওয়ার দাবি জানাচ্ছে। পরিবেশ দূষণের কারণে প্রাণের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। দিনের পর দিন প্রকৃতির উপর মানুষের হস্তক্ষেপ সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।  

অথচ প্রকৃতির কাছে অনেক কিছু শেখার আছে। নিবিড় ভাবে খেয়াল করলে দেখা যায় প্রকৃতির শৃঙ্খলা এবং ওদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা । পরিবেশের প্রতিটি উপাদানের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার গভীর সম্পর্ক আছে। এ সম্পর্কের নাম দেয়া হয়েছে বাস্তুতন্ত্র। আমাদের খামখেয়ালি বা অজ্ঞতার জন্যে প্রকৃতির এ বাস্তুসংস্থান থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারছি না। এদের জৈবিক ক্রিয়া এবং জীবন চক্রে টেকসই ব্যবহার লক্ষ করা যায়। বাস্তুতন্ত্রের প্রতিটি ধাপে যে চেইন রয়েছে তা সুশৃঙ্খল ভাবে চলে। প্রয়োজনের মাত্রা বুঝে ব্যবহার, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য উৎপাদন নিশ্চিত করা এ চক্রের ব্যবস্থাপনায় থাকে। অর্থাৎ তন্ত্রের কোথাও কোন উপাদান নিঃশেষ হবে না, যে চেইন রয়েছে তা ভেঙে যাবে না। এটা চলতে থাকবে ভারসাম্য বজায় রেখে। আর আমরা সৃষ্টির সেরা জীব হয়েও সম্পদের সুষম বণ্টন বা ব্যবহার করতে খামখেয়ালি করি। অতি আহরণ, বিনষ্ট করা, কুক্ষিগত করা, ধ্বংস করা, নিঃশেষ করে ভারসাম্যহীন করাই যেন আমাদের কাজে পরিনত হয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদের উৎস, প্রাচুর্য্য, ধারাবাহিক প্রবাহ এসব বিষয় ভাববার মতো বিচক্ষনতা হৃাস পাচ্ছে।
গবেষণায় বার বার হুশিয়ারি করা হচ্ছে যে প্রকৃতি ভারসাম্য হারাচ্ছে, প্রাকৃতিক সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংরক্ষণের যথোপযুক্ত পরিকল্পনার অভাবে বনভূমির বিনাশ, প্রাণি শিকার, শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং জনসচেতনতার অভাবে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। ফলে প্রকৃতিতে জানা অজানা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও রোগজীবাণুর মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, মেরুর বরফ গলন, গ্রীনহাউজ ইফেক্ট সহ অন্যান্য কারণে বন্যা, ক্ষড়া, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, প্লাবন ও মহামারির মতো দুর্যোগ বেড়ে যাচ্ছে।
প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ক প্রতিষ্ঠান, গবেষক ও বিশেষজ্ঞ মহল গত কয়েক দশক যাবত পরিবেশ সংরক্ষণের যথোপযুক্ত পরিকল্পনার কথাই বলে আসছেন। পৃথিবীর অস্তিত্ব রক্ষায় পরিবেশ বাঁচাতে হবে।

বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতির বিষয়টি ভাবনার বিস্ময় হতে পারে। কোভিড-১৯ এর ভয়াবহতায় বিশ্বের জনজীবন থমকে গেছে। শত সহস্র বিলিয়ন ক্ষতির হিসাব করতে হচ্ছে। অথচ এর পূর্ববর্তী সময়ের সার্স, মার্স, স্পেনিশ ফ্লু ও অন্যান্য রোগের সময়েও প্রকৃতি ও পরিবেশের পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। মাটি, পানি ও বায়ু দূষণ সহ অন্যান্য পরিবেশ দূষণ কতোটা মারাত্মক হতে পারে তা দেখার জন্য আরো কতো ভয়াবহতা মোকাবিলা করতে হতে পারে তা হয়তো আমাদের অজানা। এসব বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে শিক্ষামূলক অনেক আলোচনা করা হয়ে থাকে। তারপরও প্রকৃতির উপর নিরন্তর অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।  

উন্নত বিশ্বের প্রযুক্তি ও শিল্পায়নের কারণে লাগামহীন বেড়ে চলেছে কার্বন নিঃসরণ ও গ্রীনহাউজ গ্যাস উদগীরণ। উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলো এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। এভাবে নিষ্পেষিত প্রকৃতি টিকে থাকার লড়াইয়ে পুনর্বাসন খোঁজে। জনজীবনে দুর্ভোগ হোক এমন পুনর্বাসন আমাদের কাম্য হতে পারে না। কোভিড-১৯ পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, লকডাউনের মতো কার্যক্রম প্রকৃতির পুনর্বাসনে উপকারী ভূমিকা পালন করে থাকে। চলতি সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে যে,  প্রকৃতি আগের তুলনায় অনেক বেশি সজীব হচ্ছে। প্রকৃতি তার স্বরূপে ফিরে আসতে শুরু করেছে। এসময়ে বাতাসের গুণগত মান গতবছরের তুলনায় ভালো। দৈনন্দিন তাপমাত্রা কিছুটা হৃাস পেয়েছে।  আবহাওয়ার অন্যান্য প্যারামিটার গুলোতেও পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর এই সময়ে গাছের পাতায় ধুলাবালি কম, বৃষ্টিপাত বেশি, শব্দ দূষণ কম, জলাশয়ের পানির দূষণ কমছে ইত্যাদি। অনেকে বলছেন, পাখিদের আনাগোনা বেড়ে গেছে, হরিণ সহ অন্যান্য বন্য প্রাণী দৃষ্টিগোচর হচ্ছে, নদী, খাল বিলে বৈচিত্র্য ফিরে আসছে। সমুদ্রে, নদীর মিঠাপানিতেও ডলফিন দেখা যাচ্ছে। ঝিঝি পোকা, ফড়িং ও রঙিন ডানার প্রজাপতিরা ঘোরে বেড়াচ্ছে।

তবে আশঙ্কাও আছে, যেমন স্বাস্থ্য খাতে ব্যবহৃত সরঞ্জামের বর্জ্য, রাসায়নি দ্রব্যাদি, জীবাণুনাশক, পিপিই, মাস্ক, গ্লাভস এসবের সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে পরিবেশ দূষেেণ নতুন মাত্রা যোগ হবে। তাছাড়া লকডাউন পরবর্তী অর্থনীতির চাকা সচল করতে অধিক উৎপাদনমুখী কাজের কারণে পরিবেশের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। লকডাউনের এপিঠ ওপিঠ দুটোই আছে। প্রকৃতির পুনর্বাসনে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সম্পর্কে অনেকেই মত দিয়েছেন। তাহলে প্রকৃতি কী লকডাউন চায়? এ প্রশ্নের বহুমাত্রিক উত্তর রয়েছে, অনেক তর্ক বির্তক রয়েছে। কেননা জনজীবনের স্বাভাবিক গতিধারা, অন্যান্য মৌলিক ও মানবিক চাহিদার বিষয় ভাববার ব্যাপার থাকে। তবে প্রকৃতি লকডাউন বুঝে না প্রকৃতি শুধু ভারসাম্য ফিরে পেতে চায়, তার নিজস্ব ছন্দ খুঁজে বেড়ায়। নয়নের পাতা যেমন নয়নের অংশ। বিশ্রাম যেমন কাজেরই অংশ তেমনি প্রকৃতির পুনর্বাসনের জন্য প্রকৃতিকে স্পেস দেয়াটাও হতে পারে পরিবেশ সংরক্ষণের অংশ। এজন্য টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত পরিসরে পরিকল্পনা অনুযায়ী লকডাউনের মতো ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে রাস্ট্রের সার্বিক স্বাভাবিক গতিধারার কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা করা যেতে পারে। কেননা প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ সংরক্ষণের বিকল্প নেই।  

বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সংরক্ষণের বিভিন্ন আইন ও পদক্ষেপ রয়েছে। পবিত্র সংবিধানে এ সংক্রান্ত বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই প্রশংসিত হয়েছে। গৃহীত কার্যক্রমগুলি প্রশংসার দাবিদার। এসব কার্যক্রম ও আইনের প্রয়োগ আরো জোরদার হবে এটাই কাম্য হতে পারে।

জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি উচ্চ জীববৈচিত্র্য সম্পূর্ণ এলাকার সংরক্ষণ, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত ও দূষিত গ্যাস নির্গমন হৃাসের ব্যাপারে সবাইকে উজ্জীবিত করে একসাথে কাজ করতে হবে। পরিশেষে বলা যায় প্রকৃতির সাথে অত্যাচারী আচরণের ফলাফল জনজীবনের জন্য দুর্ভোগের কারণ হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী লকডাউন এড়াতে হলে পরিবেশ ও   প্রকৃতির ভাষা বুঝতে হবে, প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক/বার্তা প্রেরক 
জাহাঙ্গীর আলম তরফদার
প্রভাষক, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ
সরকারি এম এম আলী কলেজ,কাগমারী, টাঙ্গাইল। 



সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

পরিবেশ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ১২৯৬ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই