তারিখ : ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, বুধবার

সংবাদ শিরোনাম

বিস্তারিত বিষয়

ভালুকার মল্লিকবাড়ি হানাদার ক্যাম্প খুন ধর্ষনের স্বাক্ষী

ভালুকার মল্লিকবাড়ি হানাদার ক্যাম্প খুন ধর্ষনের স্বাক্ষী  
[ভালুকা ডট কম : ০১ ডিসেম্বর]
পাক হানাদারদের নির্মমতার স্বাক্ষী মহান মুক্তিযোদ্ধের স্মৃতি চিহ্ন আজও ভালুকার সাধারণ মানুষ ও বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা ভুলতে পারেনি ভালুকার মল্লিকবাড়ী বাজারে ৫১ বছর যাবৎ পরিত্যক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বীজ গুদাম হানাদার ক্যাম্প ঘরটির কথা। দেশ স্বাধীনের পর হতেই এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।

ভালুকা সদর হতে ৬ কিলোমিটার পশ্চিমে মল্লিকবাড়ী বাজারে পাকিস্তান আমলে নির্মিত সার ও বিজ বিক্রয়ের বিশাল পাকা গোদাম ঘরটিতে ১৯৭১ সনে স্থানীয় আলবদর রাজাকারদের সহায়তায় পাক হানাদার বাহিনী ক্যাম্প স্থাপনের পর ওই এলাকায় লুটতরাজ অগ্নি সংযোগ নারী ধর্ষণ ও নিরিহ মানুষ হত্যায় মেতে উঠে হানাদাররা। দেশ স্বাধীনের পর কেউ নজর দেয়নি হানাদারদের ওই ক্যাম্প টির দিকে। কৌতুহল নিয়ে বুধবার সরজমিন মল্লিকবাড়ী বাজারের সেই ক্যাম্পের সামনে গেলে ৭১’এর অনেক কথা অনেক দুঃস্বপ্নের স্মৃতি মনের আয়নায় ভাসতে থাকে। দিনের আলোতেও অন্ধকারাচ্ছন্ন সাপ বিচ্ছুর আবাসস্থল গোদাম ঘরটিতে উকি দিলে গা শিউরে উঠে। আগাছা পরগাছায় ছাদ সহ চারিদিক ঘিরে যেন আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে প্রতি নিয়ত পাশবিক নির্যাতনে ধর্ষণের শিকার অসহায় মা-বোনদের সেই করুন আর্ত চিৎকার আর গোংরানির চাপা শব্দ। ওই ঘরটি যেন প্রতিনিয়ত বলছে “ আমরা জীবন উৎসর্গ করে তোমাদের দিয়ে গেলাম স্বাধীনতার লাল সূর্য”।

ক্যাম্পের পাশেই বীর মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধকালীন প্লাটন কমান্ডার গাজী জিন্নত আলীর (৭৫) বাড়ী। আজীবন আওয়ামীলীগ সমর্থক বঙ্গবন্ধুর অনুসারী বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী জিন্নত আলী সপ্তাহের প্রতি শনিবার মল্লিকবাড়ী বাজারে চায়ের দোকানদারি করেন। এ ছারা মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান। স্ত্রী রওশনারা খাতুন (৬৫) ও চার ছেলে নাতি নাত্ন নিয়ে তার সংসার।

ওই ক্যাম্পে পাক রাজাকারদের নির্মম অত্যাচারের ঘটনা বলতে গিয়ে তিনি কিছুক্ষনের জন্য নিরব হয়ে যান। ৭১ এ মহান মুক্তিযোদ্ধে ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষনে উদ্বুদ্ধ হয়ে বৃটিশ ভারত সেনাবাহিনীর (অবঃ) সুবেদার তৎকালীন ভালুকা থানা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি, আফসার উদ্দীন আহম্মেদ ৭১ এর ১৭ এপ্রিল ১ টি মাত্র রাইফেল ও ৮ জন সদস্য নিয়ে ভালুকার মল্লিকবাড়ী বাজারের খেলু ফকিরের বাড়ীতে মুক্তি বাহিনীর একটি গেড়িলা দল গঠন করেন। পরবর্তীতে ভালুকা থানা দখল করে ১৫/১৬ টি রাইফেল ও একটি এল, এম,জি সহ প্রচুর গোলাবারুদ সংগ্রহ করেন। এর কয়েক দিনের মাথায় কাউরাইদ হতে খীরু নদী দিয়ে ভালুকা থানায় আসার পথে পনাশাইল নামক স্থানে পাক বাহিনীর অস্ত্র ও গোলা-বারুদ সহ একটি নৌকা আটক করে মুক্তিযোদ্ধারা। প্রচুর অস্ত্রসস্ত্র উদ্ধার করে গেরিলা দলটি শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত হয়। তিনি জানান ভালুকা সদরে শক্তিশালী পাক রাজাকার ক্যাম্প থাকা সত্বেও মল্লিকবাড়ী বাজারে মুক্তি বাহিনীর দল গঠনকে কেন্দ্র করে সেখানে আর একটি পাক রাজাকার ক্যাম্প ওই গোদাম ঘরটিতে স্থাপন করা হয়। তিনি জানান সম্ভবত অক্টোবর মাসের প্রথম দিকে মল্লিকবাড়ী ক্যাম্পের হানাদার বাহিনি পাশর্বর্তী তালাব ও নয়নপুর গ্রামে প্রবেশ করে অগ্নি সংযোগ ও লুটতরাজ চালায়। এ সময় স্থানীয় রাজাকার আলবদরদের সহযোগিতায় দুই গ্রামের ১০/১২ জন যুবতি মেয়ে সহ নয়নপুর গ্রামের আদিবাসী নীল কমল ডাক্তারের দুই ছেলে পিযুস ও নিহারকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে আসে। ওই ক্যাম্পে আটকে রেখে যুবতিদের ধর্ষনের পর বেওনেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করে। পরে যে বাড়ীতে মুক্তিযোদ্ধা দল গঠন হয়েছিল সেই খেলু ফকিরের বাড়ীর গভীর কুপে (ইন্দ্রার) মধ্যে লাশ গুলি ফেলে দেয়। নীল কমল ডাক্তারের দুই ছেলেকেও হত্যার পর লাশ ওই কুপে ফেলে দেয়া হয়। এ রকম আরও অনেক নারী পুরুষ এ ক্যাম্পে ধরে এনে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে যার কোন পরিসংখ্যান হয়তো কারও জানানেই।

এ ঘটনার পর ৭ অক্টোবর ১৯৭১ মেজর আফসার উদ্দীনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা তিনদিক থেকে ওই ক্যাম্প আক্রমন করলে পাকসেনা ও রাজাকাররা ভালুকা ক্যাম্পে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। তিনি জানান দেশ স¦াধীনের এত বছর পার হলেও ৭১ এর বধ্যভূমি হিসেবে এ স্থানটিতে কিছুই করা হয়নি। গাজী জিন্নত আলীর আবেদনের প্রেক্ষিতে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার মরহুম মৌফিজ উদ্দীন ওই ক্যাম্পের পাশে একটি স্মৃতিস্তম্ব নিমার্ণ করেন। তিনি জানান ভালুকা- গফরগাঁও সড়কে ভাওয়ালিয়বাজু নামক স্থানে ২৫ জুন ১৯৭১ হানাদারদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে মল্লিকবাড়ী বাজারের তরুন মুক্তিযোদ্ধা অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র আঃ মান্নান গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রথম শহীদ হলেও তার স্মৃতি ধরে রাখার মতো কিছুই করা হয়নি। মল্লিকবাড়ী গ্রামের সহযোদ্ধা নারায়ন পাল, শহীদ আঃ মান্নান, আমজত আলী,খালেক মাষ্টার, রতন মাষ্টার, সাইকেল মেকার সমর উদ্দীন আরও অনেকে ছিলেন। আফসার বাহিনী যুদ্ধকালীন বিভিন্ন সময়ে একাধিক বার ভালুকা পাক হানাদার ক্যাম্পে আক্রমন চালিয়েছে।

এছারা আমলীতলাযুদ্ধ, বল্লা যুদ্ধ, ত্রিশাল,গফরগাঁও,ফুলবাড়ীয়া,শ্রীপুর, মল্লিকবাড়ী, মেদুয়ারী সহ বিভিন্ন স্থানে পাকসেনা ও রাজাকারদের সাথে আফসার বাহিনীর অসংখ্য যুদ্ধ হয়। এসব যুদ্ধে আফসার বাহিনীর সাথে তিনি অংশ গ্রহন করেন। দীর্ঘ ৯ মাসের বিভিন্ন যুদ্ধে মেজর আফসার উদ্দীনের পুত্র নাজিম উদ্দীন সহ ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মল্লিকবাড়ী বাজারে পাক রাজাকারদের ক্যাম্প নিষ্ঠুর বর্বরোচিত পৈচাশিক গণ ধর্ষণ ও হত্যা যজ্ঞের ৫১ বছরের নিরব স্বাক্ষী পরিত্যাক্ত বীজ গোদাম ঘরটি বধ্যভূমি ঘোষনা ও সংস্কার করে এখানে মহান মুক্তিযোদ্ধের স্মৃতি সম্বলিত একটি সংগ্রহশালা করার জন্য বিজয়ের মাসে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর সুদৃষ্টি দাবী জানিয়েছেন।#




সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

অন্যান্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ৬৫৭৬ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই