তারিখ : ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৯, রবিবার

সংবাদ শিরোনাম

বিস্তারিত বিষয়

জনবল সংকটে ভুগছে সান্তাহার রেলওয়ে জংশন স্টেশন

জনবল সংকটে ভুগছে সান্তাহার রেলওয়ে জংশন স্টেশন
[ভালুকা ডট কম : ১৫ জানুয়ারী]
দেশের সবচেয়ে বড় পরিবহন সার্ভিস হচ্ছে রেলওয়ে। ব্রিটিশ শাসন আমলে এই ভারত বর্ষে সূচনা হয় রেলওয়ে পরিবহন সার্ভিসের। তারই ধারাবাহিকতায় বঙ্গ জনপদে চালু হয় রেলওয়ে পরিবহনের সূচনা। সেই সময় থেকে মানুষ রেলওয়ের ট্রেনে কম সময়ে ও কম খরচে আরামদায়ক চলাচল করে আসছেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশ থেকে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে ট্রেন যোগাযোগ। এরপর থেকে স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও কাঙ্খিত আধুনিকতার ছোঁয়া স্পর্শ করেনি রেলওয়ে সার্ভিসে। বর্তমান সরকারের আমলে ট্রেন ব্যবস্থায় ঢেলে সাজানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যুক্ত করা হচ্ছে নতুন নতুন ট্রেন সার্ভিস। কিন্তু সংস্কার করা হচ্ছে না রেল স্টেশনগুলোর ও জনকাঠামোতে। দিনের পর দিন জনবল সংকটের কারণে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে ছোট-বড় বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশন। এছাড়াও দেশের বৃহত্তম সব রেলওয়ে জংশন স্টেশনগুলোতে বৃদ্ধি পাচ্ছে চরম জনবল সংকট। যার কারণে উন্নত মানের সেবা থেকে প্রতিদিন বঞ্চিত হচ্ছে ট্রেনে চলাচল করা যাত্রী সাধারনরা।

৩টি জেলার মোহনায় অবস্থিত উত্তরবঙ্গের প্রসিদ্ধ রেলওয়ে জংশন স্টেশন সান্তাহার। ১৯০০ সালে ব্রিটিশ শাসন আমলে তৎকালীন লর্ড হ্যান্ডিজের নেতৃত্বে স্থাপন করা হয় এই ঐতিহ্যবাহী সান্তাহার রেলওয়ে জংশন স্টেশন। সেই সময় থেকে এখনো এই স্টেশনে বিন্দুমাত্র আধুনিকতার কোন ছোঁয়াই স্পর্শ করেনি। চরম জনবলের সংকটের কারণে নাজুক অবস্থায় পড়ে গেছে এই ঐতিহ্যবাহী স্টেশনটি। দিন যতই যাচ্ছে ততই এই জনবল সংকট চরম আকার ধারন করছে। যার কারণে উন্নত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এই স্টেশন দিয়ে চলাচল করা হাজার হাজার মানুষ। প্রতিদিন এই স্টেশন দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলাচল করছে যাত্রীবাহী ৩৪টি মিটার গেজ ও ব্রড গেজের ট্রেন। এছাড়াও মালবাহী ট্রেনতো রয়েছে।

এই স্টেশন থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে ট্রেনের জন্য। বর্তমানে সড়ক পথের বেহাল দশা হওয়ার কারণে বিশেষ করে ঢাকামুখি মানুষরা ট্রেন মুখি হচ্ছেন। যতই দিন যাচ্ছে ততই ট্রেনে ভ্রমন করার মানসিকতা বাড়ছে ভ্রমনকারীদের। ইদানিং সড়ক পথে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় দুর্ঘটনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার কারণে ভ্রমনকারীদের মানসিকতার পরিবর্তন হচ্ছে। তাই ট্রেনে যতই ভীড় হোক না কেন ভ্রমনকারীরা ভ্রমনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ট্রেনের ছাঁদে ভ্রমন করতে বাধ্য হচ্ছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাদুর ঝোলা হয়েই ট্রেনে চলাচল করছেন তারা।

স্টেশন সূত্রে জানা, এই স্টেশনের প্রধান শাখা হচ্ছে পরিবহন শাখা। এই পরিবহন শাখায় দীর্ঘদিন যাবত চরম জনবল সংকট বিরাজ করছে। স্টেশন কাঠামো অনুসারে পরিবহন শাখায় মোট জনবল থাকার বিধান রয়েছে ৫৯জন। কিন্তু দীর্ঘদিন যাবত রয়েছে মাত্র ২৬জন। শূন্য রয়েছে ৩৩টি পদ। স্টেশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ন শাখা হচ্ছে বাণিজ্য বিভাগ। এক সময় ট্রেনের এই বাণিজ্য শাখাই ছিলো দেশের বিভিন্ন স্থানে মালামাল পরিবহনের সবচেয়ে সুবিধাজনক ও লাভজনক মাধ্যম। কিন্তু দিন দিন সড়ক পথের উন্নত হওয়ায় কদর কমেছে এই বাণিজ্য শাখার। তবুও এখনো দেশের বিভিন্ন স্থানে ট্রেনের এই বাণিজ্য শাখার মাধ্যমে পন্য পরিবহন করা হচ্ছে। এই শাখায় মোট ৫২জন জনবল থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র ১৭জন আর শূন্য রয়েছে ৩৫টি পদ। ইয়ার্ড বিভাগের পরিবহন শাখায় মোট ৩৬জন জনবল থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র ৬জন আর শূন্য রয়েছে ৩০টি পদ। বাণিজ্য শাখায় মোট ১৫টি পদে জনবল থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে একটিও নেই শূন্য রয়েছে সবগুলো পদ। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত সব জরাজীর্ন ভবনে চলছে এই স্টেশনের সকল কার্যক্রম। যে কোন সময়ে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এমনটাই আশঙ্কা করছেন এই স্টেশনে কর্তব্যরত সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তাই এখানে একটি আধুনিক মান সম্মত রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ বর্তমানে সময়ের দাবীমাত্র।

একটি স্টেশনের হার্ট হচ্ছেন স্টেশন মাষ্টার। কিন্তু বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী স্টেশনের হার্ট নেই বললেই চলে। কোন মতে জোড়াতালি দুর্বল হার্ট দিয়ে চলছে স্টেশনের কার্যক্রম। স্টেশনে মোট ১৭জন স্টেশন মাষ্টার থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র ৭জন। নেই ১০জন স্টেশন মাষ্টার। যারা আছেন তাদেরকেই নিজের পরিবার-পরিজন ছেড়ে দিনরাত পাহারা দিতে হচ্ছে এতবড় একটি স্টেশনকে। স্টেশনে বিভিন্ন শ্রেণির যাত্রীদের জন্য অপেক্ষা করার জন্য ওয়েটিং রুম রয়েছে ৩টি। প্রতিটি ওয়েটিং রুমে ২জন করে আয়া থাকার কথা থাকলেও রয়েছে মাত্র ১জন আর নেই ৫জন। তাই স্টেশনের ওয়েটিং রুমগুলো অধিকাংশ সময়ই বন্ধ রাখা হয়। আর মাঝে মধ্যেতো ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় ঘঠে। তখন ওয়েটিং রুমে আয়া না থাকার কারণে রুমগুলো বন্ধ রাখা হয় আর ঘন্টার পর ঘন্টা যাত্রীদের চরম নিরাপত্তাহীনতায় স্টেশনের আনাচে-কানাচে অপক্ষো করতে হয়।

স্টেশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ন শাখা হচ্ছে টিকেট শাখা। যে শাখা থেকে সরকার প্রতিদিন আয় করছেন লাখ লাখ টাকা রাজস্ব। সেই টিকেট শাখায় মোট ৮টি পদে লোকবল থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছে ৫জন আর শূন্য রয়েছে ৩টি পদ। তাই অনেক সময় স্টেশন কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েই ভাড়া লোক দিয়ে বিক্রয় করেন ট্রেনের টিকেট। এছাড়াও স্টেশনগুলোর প্লাটফরম ও প্লাটফরমের টিনের ছাউনিগুলোর অবস্থা আরো বেহাল। বর্ষা মৌসুমে স্টেশনের প্লাটফরমের নিচে দাড়িয়ে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করার মতো জো নেই। দীর্ঘদিনের মরিচা ধরা টিনের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে হাজারো ফুটো। যে ফুটো দিয়ে রাতে আকাশের চাঁদ ও তারা দেখা যায়। প্লাটফরমগুলোতে নেই পর্যাপ্ত পরিমাণ বৈদ্যুতিক ফ্যানের ব্যবস্থা। তাই প্রচন্ড গরমের সময়ে কষ্ট করেই স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে হয় যাত্রী সাধারনদের। রাতের বেলায় প্লাটফরমে অপেক্ষারত যাত্রী সাধারনদের নিরাপত্তা নেই বললেই চলে।

এছাড়াও চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ নেই আসন সংখ্যার। দিন যতই যাচ্ছে ততই আসন সংখ্যার চাহিদা বৃদ্ধি পেলেও বরাদ্দ দেওয়ার কোন পদক্ষেপ নেই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের। অপরদিকে সম্প্রতি ঢাকাগামী দুটি ট্রেন পঞ্চগড় জেলা থেকে নতুন করে চলাচল করায় এই স্টেশনে আসনের যেটুকু বরাদ্দ দেওয়া ছিলো সেই বরাদ্দ থেকেই কেটে নেওয়া হয়েছে প্রায় অর্ধেক আসন সংখ্যা। এতে করে সান্তাহার স্টেশন থেকে ট্রেনে চলাচলকারী যাত্রীসহ স্টেশন কর্তৃপক্ষকে প্রতিদিনই চরম বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে। অনেকেই টিকেট ছাড়াই ট্রেনে উঠে ট্রেনে কর্তব্যরত কর্মচারী কিংবা কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে সরকারকে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চলাচল করছেন।

সান্তাহারের সচেতনমহলের দাবী এই জনপদের মানুষের উন্নত জীবন-যাপনের কথা চিন্তা করে এবং গ্রামকে শহর করার যে অঙ্গিকার বর্তমান সরকারের সেদিক থেকে সান্তাহারবাসী একটি আধুনিক মানসম্মত রেলওয়ে স্টেশন পাওয়ার কোটায় অনেকটা এগিয়ে আছে। বর্তমান সরকার উন্নয়নের সরকার। দেশের বিভিন্ন স্থানে বাস্তবায়িত হচ্ছে বড় বড় মেগা প্রকল্প। দেশের মধ্যে অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী রেলওয়ে স্টেশন এই সান্তাহার জংশন স্টেশন। কিন্তু দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অনুসারে এখানে এখনো আধুনিকতার কোন ছোঁয়াই লাগেনি। রেলওয়ের অনেক জায়গা বেদখল হয়ে আছে সেগুলো উদ্ধার করে এখানে একটি আধুনিক মানসম্মত রেলওয়ে স্টেশন অতিদ্রুত নির্মাণ এবং রেলগাড়ীতে ভ্রমনকারী যাত্রীদের আরো উন্নত সেবা প্রদান নিশ্চিত করা হোক এটাই সচেতনমহলের চাওয়া।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মজিদসহ আরো অনেকেই বলেন, বর্তমান স্টেশন মাস্টারের তদারকিতে স্টেশনের পরিবেশ অনেকটাই বদলে গেছে। আগে এই স্টেশনে দিনে-দুপুরে পকেটমার, সিচকে চোরদের আস্তানা ছিলো। যাত্রীদের এবং তাদের মালামালের বিন্দুমাত্র নিরাপত্তা ছিলো না। কিন্তু বর্তমানে স্টেশনে মানসম্মত পরিবেশ অনেকটাই ফিরে এসেছে। তবুও স্টেশনের হাজারো সমস্যা রয়েছে। এখানে একটি আধুনিক মানের স্টেশন ভবন বর্তমানে সময়ের দাবী মাত্র, আসন সংখ্যার আরো বরাদ্দ প্রয়োজন, প্রয়োজন পর্যাপ্ত জনবলসহ অনেক কিছুর যেগুলোর অভাবে স্টেশনটি দিন দিন তার মর্যাদা হারিয়ে ফেলছে। তাই বর্তমান সরকার প্রধানের কাছে আমাদের আকুল আবেদন যে তিনি অতিদ্রুত এই স্টেশনের দিকে সুদৃষ্টি দিবেন এবং স্টেশনের বেহাল দশা দূর করতে শক্তিশালী পদক্ষেপ নিবেন।

সান্তাহার রেলওয়ে স্টেশনের কর্তব্যরত স্টেশর মাস্টার মো: রেজাউল করিম (ডালিম) বলেন, সীমিত সংখ্যক জনবল নিয়ে আমি স্টেশনে মানসম্মত সেবা প্রদান ও কার্যক্রম অব্যাহত রাখার চেষ্টা চালিয়ে আসছি। তবে স্টেশনের এহেন দশা দূর করার জন্য অতিদ্রুত পর্যাপ্ত জনবল প্রয়োজন। আমি প্রতিনিয়ত রেলওয়ের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এই স্টেশনের জনবল সংকট ও বেহাল দশার কথা লিখিত ও মৌখিক ভাবে জানিয়ে আসছি কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোন লাভ হয়নি।#





সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ৫৫৭ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই