তারিখ : ২৪ জুন ২০২১, বৃহস্পতিবার

সংবাদ শিরোনাম

বিস্তারিত বিষয়

করোনায় এবারও নিরানন্দ ঈদ উৎসব

করোনায় এবারও নিরানন্দ ঈদ উৎসব
[ভালুকা ডট কম : ০৭ মে]
ঈদুল ফিতর সারা বিশ্বের ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও জাতীয় উৎসব। ঈদুল ফিতরের এই দিনটি অশেষ তাৎপর্য ও মহিমায় অনন্য। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পর শাওয়ালের বাঁকা চাঁদ নিয়ে আসে পরম আনন্দ ও খুশির ঈদ। মুসলমানেরা এই দিনটি ধর্মীয় কর্তব্যপালনসহ খুব আনন্দের সাথে পালন করে থাকে। এদিন যে সার্বজনীন আনন্দধারা প্রবাহিত হয়, তা শাশ্বত পুণ্য দ্বারা পরিপূর্ণ।

নতুন চাঁদ দেখা মাত্র রেডিও-টেলিভিশন ও পাড়া-মহল্লার মসজিদের মাইকে ঘোষিত হয় খুশির বার্তা- ‘ঈদ মোবারক’। সেই সঙ্গে চারদিকে শোনা যায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত রোজার ঈদের গান: ‘ও মন্ রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ্।/ তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন্ আসমানী তাগিদ।

ঈদুল ফিতর’ শব্দ দুটিও আরবি, যার অর্থ হচ্ছে উৎসব, আনন্দ, খুশি, রোজা ভঙ্গকরণ ইত্যাদি। আর তাই ঈদ মানেই আনন্দ ও খুশির উচ্ছল-উচ্ছ্বাসে হারিয়ে যাওয়ার উৎসব। ঈদ প্রতিবছর চান্দ্র বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাসের নির্দিষ্ট তারিখে নির্দিষ্ট রীতিতে এক অনন্য আনন্দ-বৈভব বিলাতে আমাদের মাঝে ফিরে আসে। দীর্ঘ এক মাস কঠোর সিয়াম সাধনা বা রোজা রাখা ও ইবাদত-বন্দেগির পর উদযাপিত হয় ঈদুল ফিতর; যা রোজার ঈদ নামে বহুল পরিচিত। মুসলিম উম্মাহ এক মাসের রোজা শেষে আল্লাহর বিশেষ নিয়ামতের শুকরিয়াস্বরূপ এই আনন্দ-উৎসব পালন করেন। এই এক মাসের রোজা শেষে আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমে দিনটিকে স্মরণীয় করার নাম-ই হলো “ঈদ”।ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সানন্দে ঘোষণা করেছেন,প্রত্যেক জাতিরই নিজস্ব আনন্দ-উৎসব রয়েছে, আমাদের আনন্দ-উৎসব হচ্ছে এই ঈদ।

ঈদ এমন এক নির্মল আনন্দের আয়োজন, যেখানে মানুষ আত্মশুদ্ধির আনন্দে পরস্পরের মেলবন্ধনে ঐক্যবদ্ধ হন এবং আনন্দ সমভাগাভাগি করেন। ঈদুল ফিতর বা রোজা ভাঙার আনন্দ-উৎসব এমন এক পরিচ্ছন্ন আনন্দ অনুভূতি জাগ্রত করে, যা মানবিক মূল্যবোধ সমুন্নত করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের পথপরিক্রমায় চলতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অনুপ্রাণিত করে। ফলে বছরজুড়ে নানা দুঃখ-কষ্ট, মান-অভিমান, প্রতিকূলতা, পাওয়া না পাওয়ার সকল বেদনা ভুলে ঈদের দিন মানুষ সবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলিত হন।

ঈদ উৎসব পালনেও রয়েছে বেশকিছু রীতিনীতি। যেমন, সামর্থ অনুযায়ী ঈদের দিন সকালে সকলে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে নতুন পোশাক পরিধান করা, গায়ে সুগন্ধি মাখা, পুরুষরা ঈদগাহে বা মসজিদে ঈদের সালাত আদায় করতে যাওয়া, সালাত শেষে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং আত্মীয় স্বজনের বাড়ীতে গিয়ে মিষ্টিমুখ করা।

ঈদ ধনী-গরিব সব মানুষের মহামিলনের পরিবেশ সৃষ্টি করে। ফলে ঈদের দিন ঈদগাহে বা মসজিদে ঈদের নামাজে বিপুলসংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসল্লির সমাগম হয়। রমজান মাসের সংযম ও আত্মশুদ্ধি অনুশীলনের পর ঈদুল ফিতর ধনী-গরিব-দিনমজুর নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষকে আরও ঘনিষ্ঠ বন্ধনে আবদ্ধ করে এবং সবার মধ্যে গড়ে ওঠে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যের বন্ধন। এইদিন ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, মালিক-শ্রমিক নির্বিশেষে সবাই সুশৃঙ্খলভাবে কাতারবদ্ধ হয়ে ঈদের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে পরিচিত-অপরিচিত সবাই একে অপরকে “ঈদ মোবারক বা ঈদ মুবারক” বলে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করে জড়িয়ে কোলাকুলি করে সাম্যের জয়ধ্বনি করেন। এই কোলাকুলি উভয়ের মধ্যে সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ভালোবাসার বন্ধনকে নতুন করে আবদ্ধ করে। প্রকৃতপক্ষে ঈদ ধনী-দরিদ্র, সুখী-অসুখী, আবালবৃদ্ধবনিতা সব মানুষের জন্য কোনো না কোনোভাবে নিয়ে আসে নির্মল আনন্দের আয়োজন। ঈদ ধর্মীয় নিয়মনীতির মাধ্যমে সর্বস্তরের মানুষকে ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে এবং পরস্পরের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের শিক্ষা দেয়।

রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দান, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান, ঢাকার ধানমন্ডি শাহী ঈদগাহ বা মুঘল ঈদগাহ, সিলেটের শাহী ঈদগাহসহ দেশের সব ঈদগাহ ও মসজিদে ঈদের জামাত শেষে পার্থিব সুখ-শান্তি, স্বস্তি আর পারলৌকিক মুক্তি কামনা করে আল্লাহর দরবারে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। সেই সঙ্গে বিশ্বশান্তি এবং দেশ-জাতি ও মুসলিম উম্মাহর উত্তরোত্তর শান্তি, সমৃদ্ধি, অগ্রগতি ও সংহতি কামনা করা হয়।

২০১৯ সালের শেষের দিকে চীনের উহান প্রদেশের উবেই শহরে ছড়িয়ে পড়ে নতুন ধরণের এক ভাইরাস, যার নাম দেওয়া হয়েছে “করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯”। বিশ্বব্যাপী বিস্ময়কর এই ভাইরাসটির সক্রিয় উপস্থিতি জানান দেয় ২০২০ সালে। আর একি বছর ৮ মার্চ থেকে করোনা সংক্রমণ বাংলাদেশে প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে। সেই থেকে এখনো পর্যন্ত সারা পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করছে এই অতিমহামারী “করোনা”র ভয়ঙ্কর দাপট। এই করোনা মহামারী মানুষের সহজ সরল জীবনকে কঠিন জালে অবরুদ্ধ করে দিয়েছে। মহামারী এই বিশ্বে নতুন বিষয় নয়। পৃথিবীতে মানুষ যুগে যুগে সময়ের ব্যবধানে এমন মহামারীর আক্রমণের শিকার হয়েছে বহুবার। তবে সেসব মহামারীতে অসুস্থ ব্যক্তিকে আলাদাভাবে বিচ্ছিন্ন রেখে সুস্থ মানুষকে ভিন্ন কোন নিরাপত্তার বলয় তৈরি করতে হয়নি। কিন্তু এবারের মহামারী করোনা ভাইরাস সুস্থ-অসুস্থ সব মানুষের মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব তৈরি করে সহজ যোগাযোগের পথে এক সুউচ্চ দেয়াল তৈরি করে দিয়েছে, যা বিশ্ব এই প্রথমবার উপলব্ধি করল। মানুষকে বাধ্য করল স্বাস্থ্যবিধি মানতে। শুধু আক্রান্তরাই নই, সুস্থ মানুষকেও সুস্থ থাকা সত্বেও নিরাপদ দূরত্বে থাকার নতুন স্বাস্থ্যবিধির নিয়ম শিখিয়ে ছাড়লো। ফলে করোনার মহাবিপর্যয়ে জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব পড়লো। মানুষের জীবন যাপন, আনন্দ উৎসব, ধর্মীয় রীতিনীতি সবকিছুতেই এর বিপর্যয় লক্ষ্য করা গেলো। গত বছর থেকে এখনও পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ের নানা রকম আনন্দ উৎসব থেকে শুরু করে ধর্মীয় বিধি পালনেও “পথ আটকে” বাধা সৃষ্টি করলো। ফলে বিভিন্ন জনসমাগমপূর্ণ উৎসব-আনন্দের পরিবর্তে মানুষকে একা একা গৃহবন্দী অবস্থায় সব স্মরণীয় দিন টিভিতে, ভার্চুয়াল জগতে উপভোগ করতে বাধ্য করলো।

এমনকি ২০২০ সালে রমজান মাস মুসলমানদের জন্য এক আলাদা মাত্রার বার্তা নিয়ে হাজির হয়। কারণ জামাতে তারাবির নামাজ পড়ার ক্ষেত্রেও স্বাস্থ্যবিধি মানতে হয়। ফলে বেশিরভাগ মুসল্লিকে ঘরে বসেই সেই নামাজ আদায় করতে হয়। ২৬ মার্চ থেকে সামাজিক বলয়ও এক অনাবশ্যক অচলায়তনের বেড়াজালে আটকে যায়। সেবার রমজানের মধ্যে ঈদের কেনাকাটায় এক অপ্রত্যাশিত বিঘ্নয় ঘটে। শুধু কি তাই? গত বছর প্রাণ খুলে উদযাপন করা সম্ভব হয়নি ঈদের উৎসব। মুসলমানদের এই পবিত্র ঈদে মানুষের কোলাকুলির যে রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে সেখানেও আসে এক ভয়ানক সামাজিক দূরত্ব। গত বছর থেকে জনগণ করোনা মোকাবেলা করে কেমন যেন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। গত বছরের মতো ২০২১ সালের মার্চের মাঝামাঝিতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বাংলাদেশকে আবারো আতঙ্কে অস্থির করে তুলেছে। করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের হার উর্ধগতি দেখা যাচ্ছে। রমজান শেষে আসছে ঈদ, আগামী ১৩ অথবা ১৪ মে ২০২১ পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। ফলে এবারের ঈদ-ও যে নিরানন্দ ভাবে উদযাপিত হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন চলছে লকডাউন, চলবে ১৬ মে পর্যন্ত। দেশে লকডাউন চললেও খোলা রয়েছে মর্কেট, শপিং মল, চলছে গাড়ী! ২০২০ সালে মানুষ করোনা আতঙ্কে যেমন অস্থির ছিলো কিন্তু এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ তার উল্টো! অথচ এবার করোনায় আক্রান্তের পাশাপাশি মৃতের সংখ্যাও অনেক বেশি কিন্তু এর পরেও মানুষ দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, কেনাকাটি করছে, মার্কেট, শপিং মলে ভিড় জমাচ্ছে। আমরা যদি পাশের দেশ ভারতের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো সেখানে প্রতিদিন কিভাবে করোনায় আক্রান্তের হার লাখের উপরে এবং মৃতের হার হাজার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালের কোন সিট খালি নেই, অক্সিজেন নেই, রয়েছে টিকার সংকটও! চারিদিকে হাহাকার, ঘরে ঘরে কান্নার আহাজারি, শ্মশান বা গোরস্থান সবখানে সারি সারি লাশ! ইতিমধ্যে শুনেছি ভারতের কিছু ভেরিয়েন্ট বাংলাদেশেও পাওয়া যাচ্ছে! যদি তাই হয় তাহলে এটা আমাদের জন্য একটি অশনি সংকেত! আমরা যদি এখনও সতর্ক না হই তবে আমাদের দেশেও বিপর্যয়ের সম্ভবনা রয়েছে।

একটা কথা আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে এ পর্যন্ত যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন একমাত্র তারাই জানের করোনা কী ধরণের ঘাতক! যারা এর মুখোমুখি হননি তারা হয়ত বিষয়টিকে হাল্কা করে দেখছেন। কিন্তু মনে রাখবেন দিন শেষে আপনার অসতর্কতার জন্য আপনি আপনার পরিবারকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন না তো? ঈদ বা যে কোন উৎসব আমাদের জীবনে বহুবার আসবে যদি জীবিত থাকি। কিন্তু যদি জীবনই না থাকে তাহলে এই ঈদ বা উৎসবের কোন মানে নেই। তাই সকলের প্রতি অনুরোধ, আপনারা অন্তত করোনার এই ভয়ংকর পরিস্থিতিতে নিজেদের অরক্ষিত রাখবেন না, জনসমাগম স্থানে যাতায়াত করবেন না, দোকান কিংবা শপিং মলে যাবেন না। আপনি বেঁচে থাকলে জীবনে বহু উৎসব করতে পারবেন, বহু কেনাকাটা করতে পারবেন। নিজে স্বাস্থ্যবিধি মানুন, সুরক্ষিক থাকুন, পরিবার ও প্রতিবেশীকে সুরক্ষিত রাখুন। মাস্ক পড়ুন জীবন বাঁচান।

আসছে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে আমাদের প্রার্থনা, তিনি যেন পৃথিবীর সব মানুষের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি দান করেন। পৃথিবী থেকে করোনা ভাইরাসের মহামারি উঠিয়ে নেন। পৃথিবী হোক হিংসা-বিদ্বেষ, সন্ত্রাস ও হানাহানিমুক্ত! আগামী দিনগুলো সুন্দর ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হোক! হাসি-খুশি ও ঈদের আনন্দে ভরে উঠুক প্রতিটি প্রাণ। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সংযম, সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির পরিবেশ লাভ করুক—এটাই হোক ঈদ উৎসবের ঐকান্তিক কামনা। আসুন, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপদ দুরত্ব বজায় রেখে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দিই সবার প্রাণে। সবাইকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও  আন্তরিক অভিনন্দন—‘ঈদ মোবারক!’#



সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

অন্যান্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ১৩১১ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই